বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

উপকূলীয় চিংড়ি চাষে প্রযুক্তি ও স্বপ্নের মেলবন্ধন: টেকসই ও লাভজনক ভবিষ্যৎ

শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন
জানুয়ারি ৪, ২০২৬ ৫:৪৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সাগরের তীরে, নদী খালের ধার ঘেঁষে চলে এক নিরব ধ্বনির খেলা, চিংড়ির ঘেরের জলে মাখামাখি আলো এবং হালকা হাওয়ায় ভেসে আসে চাষির স্বপ্ন। এই স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার মানুষের জীবিকা। জলবায়ু পরিবর্তনের কঠোর বাস্তবতায় বিপর্যয় এড়াতে প্রযুক্তি এখন চাষির নতুন হাতিয়ার।
মৎস্য অধিদপ্তর ও FAO এর সমন্বয়ে চালু   CBCRFAD  প্রকল্প সেই হাতিয়ারকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার চিংড়ি চাষিরা অভিজ্ঞতা বিনিময়ের উদ্দেশ্যে সাতক্ষীরা সদর সফরে আসলেন।
সফরের প্রতিটি মুহূর্তে দৃঢ়তার গল্প এবং নতুন জ্ঞানের উচ্ছ্বাস স্পষ্ট হয়ে উঠল। চাষিরা কেবল প্রযুক্তি শিখল না, বরং দেখল, কিভাবে পরিবেশবান্ধব চাষ লাভজনক ও টেকসই হতে পারে। এই অভিজ্ঞতা বিনিময় শুধু শিক্ষা নয়, এটি অনুপ্রেরণার উৎস। বর্তমান বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা একসাথে মিলে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার শক্তি জোগাচ্ছে।
উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা ও খুলনা বাংলাদেশের জলজ সম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ত পানি, অপ্রচলিত চাষ পদ্ধতি এবং রোগসংক্রান্ত ঝুঁকি এই অঞ্চলের মৎস্য চাষকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এ পরিস্থিতিতে ঋঅঙ অর্থায়িত ঈইঈজঋঅউ প্রকল্প নতুন আশার আলো নিয়ে এসেছে।
উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা ও খুলনা বাংলাদেশের জলজ সম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ত পানি, অপ্রচলিত চাষ পদ্ধতি এবং রোগসংক্রান্ত ঝুঁকি এই অঞ্চলের মৎস্য চাষকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ঋঅঙ) অর্থায়নে মৎস্য অধিদপ্তরের কমিউনিটি বেইজড ক্লাইমেট রিজিলিয়েন্ট ফিশারিজ অ্যান্ড একুয়াকালচার ডেভলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ (ঈইঈজঋঅউ) প্রকল্প নতুন আশার আলো নিয়ে এসেছে।
প্রকল্পের আওতায় খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার ৫০ জন সিবিওভুক্ত চিংড়ি চাষি অভিজ্ঞতা বিনিময়ের উদ্দেশ্যে সম্প্রতি সাতক্ষীরা সদর উপজেলা সফর করেন। সফরে চাষিদের স্বাগত জানান সাতক্ষীরা সদর সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম। দাকোপ উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুবকর সিদ্দিকের নেতৃত্বে চাষিরা অংশগ্রহণ করেন। উপস্থিত ছিলেন খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (উঋঙ)গণ, যারা চাষিদের দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। এই সফরটি দুইটি কেন্দ্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
২৬ ডিসেম্বর সকালে ধুলিহরে ২৫ জন চাষি অংশগ্রহণ করেন। এখানে প্রদর্শিত হয় বটম ক্লিন মেথড (ইঈগ) অনুযায়ী বাগদা চিংড়ি চাষ। ইঈগ হলো আধুনিক চিংড়ি চাষের একটি প্রযুক্তি, যেখানে ঘেরের তলদেশে জমে থাকা বর্জ্য নিয়মিত অপসারণের মাধ্যমে পানির গুণগত মান বজায় রাখা হয়। এতে দ্রবীভূত অক্সিজেন বৃদ্ধি পায়, বিষাক্ত গ্যাস নিয়ন্ত্রণ হয় এবং রোগ ঝুঁকি যেমন ঊগঝ, ডঝউ, ঊঐচ উলে¬খযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। আয়োজনে চাষিরা হাতে-কলমে শিখেছেন ঘেরের নকশা, কেন্দ্রাভিমুখী ঢাল ও সুপারিশকৃত গভীরতা (১.২–১.৫ মিটার) এয়ারেটর স্থাপন ও পানির সঞ্চালন ব্যবস্থা সেন্ট্রাল ড্রেন, সাইফন পাইপ ও চঠঈ/ঐউচঊ বটম ড্রেনের মাধ্যমে ¯¬াজ অপসারণ। সীমিত পানি পরিবর্তনের মাধ্যমে উঙ, ঢ়ঐ, ঞঅঘ নিয়ন্ত্রণ। অতিরিক্ত খাদ্য অপচয় রোধে ফিডিং ট্রে ব্যবহার প্রোবায়োটিক, কার্বন সোর্স (মোলাসেস) ও চুন/ডলোমাইট ব্যবহার। সাইন্টিফিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি উপস্থিত চাষিরা বলেন, “ইঈগ পদ্ধতি ব্যবহার করে আমরা শুধু রোগ কমাতে পারি না, বরং উৎপাদন ও বাজার মূল্যে বড় ধরনের উন্নতি করতে পারি,”মোঃ রাশেদুল ইসলাম, দাকোপ সিবিও চাষি।
বিকেলে অনুষ্ঠিত সেশনে ২৫ জন চাষি আধা-নিবিড় পুরুষ গলদা (গধপৎড়নৎধপযরঁস ৎড়ংবহনবৎমরর) একক লিঙ্গ চাষ পদ্ধতি শিখেছেন। এই পদ্ধতি দ্রুত বৃদ্ধি, উন্নত খাদ্য রূপান্তর হার (ঋঈজ) এবং উচ্চ বাজারমূল্য নিশ্চিত করে। উপস্থিত চাষি মো. আলমগীর হোসেন বলেন, “আগের পদ্ধতিতে অনেক ঝুঁকি থাকত, এখন আমরা সহজেই লাভজনক ও টেকসই চাষ করতে পারব।”
উভয় সাইটে প্রশ্নোত্তর ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তারা চাষিদের দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। এই অভিজ্ঞতা বিনিময় সভায় সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, বলেন, “এ ধরনের অভিজ্ঞতা বিনিময় চাষিদের বাস্তব সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম করে, এবং পরিবেশবান্ধব চাষে আগ্রহী করে তোলে।” খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, “২০২৫ সালের কর্মসূচিতে আমরা যে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি, ২০২৬ সালে তার ভিত্তিতে আরও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর সমাধান নিয়ে আসব।”
২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, অনেক চাষি এখনও প্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যার ফলে রোগ ও খাদ্য অপচয় বেশি হয়। এই সফরের মাধ্যমে তারা আধুনিক পদ্ধতি, যেমন ইঈগ এবং একক লিঙ্গ গলদা চাষ, হাতে-কলমে শিখেছে। ২০২৬ সালের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রযুক্তি আরও বেশি চাষিতে বিস্তৃত করা হবে, এবং স্থানীয় বাজারে টেকসই উৎপাদন ও লাভজনকতা নিশ্চিত করা হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আরও ওয়ার্কশপ, সেমিনার এবং অনলাইন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা বিনিময় সম্প্রসারণের লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
উপকূলীয় অঞ্চলের চিংড়ি চাষে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ মানেই ক্ষতির ঝুঁকি কমানো, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন। প্রকল্পটি চাষিরা, মৎস্য কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সুদৃঢ় সংযোগ গড়ে তুলেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সহায়ক হবে। উপস্থিত চাষি মোঃ সেলিম উদ্দিন বলেন, “আমি মনে করি, এই ধরনের অভিজ্ঞতা বিনিময় আমাদের চাষি সমাজকে এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে।”
সার্বিকভাবে বলা যায়, ঋঅঙ অর্থায়িত ঈইঈজঋঅউ প্রকল্পের এই ধরনের উদ্যোগ শুধু চাষিদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি করছে না, বরং দেশের উপকূলীয় চিংড়ি চাষে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। ২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ২০২৬ সালে আরও সুসংগঠিত, সম্প্রসারিত ও টেকসই চাষী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু হচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি দৃঢ় সমাধান হিসেবে কাজ করবে।
এই সফর প্রমাণ করছে, স্থানীয় চাষিদের জন্য হাতে-কলমে শেখার সুযোগ ও আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়, বরং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই চাষের ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। সামগ্রিকভাবে, এই অভিজ্ঞতা বিনিময় প্রক্রিয়া উপকূলীয় চিংড়ি চাষকে জলবায়ু সহনশীল, লাভজনক এবং টেকসই করার দিকেই পথ দেখাচ্ছে।
এই সফর প্রমাণ করেছে, শুধু প্রযুক্তি শেখাই নয়, চাষিরা হাতে-কলমে শিখে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে।
ইঈগ ও একক লিঙ্গ গলদা চাষের মতো আধুনিক পদ্ধতি উপকূলীয় চিংড়ি চাষকে আরও লাভজনক ও টেকসই করছে।
চাষিরা এখন জানে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে কীভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ঝুঁকি কমানো সম্ভব। উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই জলজ কৃষি, স্থানীয় অর্থনীতি এবং খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এ ধরনের উদ্যোগ অপরিহার্য। ২০২৬ সালের কর্মসূচি আরও বিস্তৃত প্রশিক্ষণ, নতুন প্রযুক্তি এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় নিয়ে আসবে। টি শুধু একটি সফর নয়, বরং চাষিরা নতুন দিগন্তে পদার্পণ করছে স্বপ্ন, দক্ষতা এবং সম্ভাবনার সঙ্গে। সতর্ক পরিকল্পনা ও সহায়তার মাধ্যমে উপকূলীয় চিংড়ি চাষে একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে। #

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।