দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিতে বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। লবণাক্ততা, জলবায়ু চাপ ও উৎপাদন অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপ পেরিয়ে বাস্তব হাঁটছে নতুন সম্ভাবনার পথে। ব্রি’র এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় বয়ারডাঙ্গা গ্রামকে যখন ‘প্রযুক্তি গ্রাম’ হিসেবে ঘোষণা করা হলো, তখনই যেন আধুনিক কৃষির দরজা খুলে গেল এলাকার শত শত কৃষকের সামনে। এখানে বিতরণ করা হলো লবণসহিষ্ণু ও উচ্চ ফলনশীল বীজধান, উন্নতমানের বীজ সংরক্ষণ পাত্র; সঙ্গে অনুষ্ঠিত হলো ব্রি ধান১০৩–এর ফসল কর্তন ও মাঠ দিবস। এগুলো শুধু অনুষ্ঠান নয় এলাকার কৃষিতে এক নতুন যুগের সূচনা।
জলবায়ু পরিবর্তনের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাই নতুন ৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণাগার উন্নয়ন (এলএসটিডি) প্রকল্প- এর অর্থায়নে ‘প্রায়োগিক পরীক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য’ বয়ারভাঙ্গা গ্রামকে প্রযুক্তি গ্রাম হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এই প্রযুক্তি গ্রামে ‘প্রায়োগিক পরীক্ষণ ও মূল্যায়ন’ এর জন্য কৃষক পর্যায়ে দক্ষিণাঞ্চলের পরিবেশ উপযোগী ব্রি উদ্ভাবিত লবণ সহিষ্ণু ও উচ্চ ফলনশীল বীজ ধান এবং বীজ সংরক্ষণ পাত্র বিতরণ করা হয়। একইসঙ্গে রোপা আমন মৌসুমের উচ্চ ফলনশীল ব্রি ধান১০৩ জাতের ফসল কর্তন ও মাঠ দিবস কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, খুলনা এর প্রধান এবং চীফ সাইন্টিফিক অফিসার ও সাতক্ষীরা-খুলনা অঞ্চলের ইনচার্জ ড. মোঃ সাজ্জাদুর রহমান, উক্ত কার্যালয়ের সাইন্টিক অফিসার বিল¬াল হোসাইন এবং এবং বটিয়াঘাটা উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ।
এসময়ে প্রযুক্তি গ্রামে প্রাথমিকভাবে বাছাইকৃত ২০ জন কৃষকের মাঝে ব্রি উদ্ভাবিত স্থানভিত্তিক আধুনিক ধানের জাতের প্রায়োগিক পরীক্ষণ ও মূল্যায়ন এবং জনপ্রিয়করণের উদ্দেশ্যে বীজধান প্রদান করা হয়। প্রযুক্তি গ্রামে আসন্ন বোরো ২০২৫-২৬ মওসুমে প্রায় ৭০ জন কৃষকের মাঠে আধুনিক ধানের জাতের (ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৯৭, ব্রি ধান৯৯, ব্রি ধান১০০, ব্রি ধান১০২, ব্রি ধান১০৫, ব্রি ধান১০৮, ব্রি ধান১১৪, ব্রি হাইব্রিড ধান৩, ব্রি হাইব্রিড ধান৫ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৮) প্রায়োগিক পরীক্ষণ ও মূল্যায়ন ট্রায়াল স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি এলএসটিডি প্রকল্পের অর্থায়নে প্রযুক্তি গ্রামের কৃষকদের মাঝে ১০০ কেজি ধারণক্ষমতা সম্পন্ন উন্নতমানের ১০টি বীজ সংরক্ষণ পাত্র বিতরণ করা হয়।
কার্যালয় প্রধান ড. মোঃ সাজ্জাদুর রহমান বলেন, এই পাত্র ব্যবহার করে কৃষকরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ধানের বীজ দীর্ঘসময় নিরাপদ ও উপযোগী অবস্থায় সংরক্ষণ করতে সক্ষম হবেন। এর ফলে বীজের গুণগতমান, অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা এবং জাতের বিশুদ্ধতা অক্ষুণœ থাকবে, যা পরবর্তী মওসুমে উচ্চ ফলনশীল ও মানসম্মত ধান উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।এছাড়াও কৃষকদের উদ্দেশ্যে ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল আধুনিক ধান থেকে সবল চারা উৎপাদনের নিয়ম, আদর্শ বীজতলা তৈরি, পরিচর্যা ও সঠিক পদ্ধতিতে চারা রোপণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপ্রযুক্তি বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। পাশাপাশি বিতরণকৃত জাতগুলোর বৈশিষ্ট্য, সম্ভাবনা ও দক্ষিণাঞ্চলে এর কার্যকারিতা সম্পর্কেও কৃষকদের অবহিত করা হয়।
তিনি বলেন ব্রি ধান১০৭ এবং ব্রি ধান১০৮ সম্পর্কে বলেন, একজন মানুষের দৈনিক প্রেটিনের চাহিদা হলো ৫৮ গ্রাম। পরীক্ষা করে দেখা গেছে একজন মানুষ যদি গড়ে দৈনিক ৪০৫ গ্রাম এ জাতের চালের ভাত খায় তবে তার দেহের চাহিদার ৭০-৭৫ শতাংশ প্রোটিনের অভাব পূরণ হবে।উপকূলীয় এলাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ লবণাক্ততা সহনশীল জাত ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৯৭ ও ব্রি ধান৯৯ বিতরণ করা হয়েছে। ব্রি ধান১০৫, যা লো জিআই বা ডায়াবেটিক রাইস নামে পরিচিত, এর গ¬াইসেমিক ইনডেক্স মাত্র ৫৫, ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য উপযোগী। কৃষকদের মাঝে আরও বিতরণ করা হয়েছে জিংক সমৃদ্ধ জাত ব্রি ধান১০২, ব¬াস্ট রোগ প্রতিরোধী ব্রি ধান১১৪ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৩, ব্রি হাইব্রিড ধান৫ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৮ । এই কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকরা আধুনিক প্রযুক্তি ও টেকসই চাষাবাদ পদ্ধতিতে আরও বেশি আগ্রহী ও দক্ষ হয়ে উঠবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অংশগ্রহণকারী কৃষাণী যুথিকা মন্ডল, এলএসটিডি প্রকল্পের এ কার্যকর উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্পনার জন্য প্রকল্প পরিচালক ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, প্রকল্পের সহায়তায় প্রযুক্তি গ্রামকে একটি আধুনিক ও কৃষিনির্ভর আদর্শ গ্রামে পরিণত করতে তাঁরা সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করবেন।
ড. মোঃ সাজ্জাদুর রহমান আরো বলেন, কৃষকদের হাতে আধুনিক, উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু সহনশীল জাত এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে প্রযুক্তি গ্রাম দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর ফলে ধান উৎপাদনে খরচ কমবে, ফলন বাড়বে এবং স্থানীয়ভাবে পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এই ধরনের প্রযুক্তি গ্রাম গড়ে তোলার মাধ্যমে কৃষিতে একটি টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং লাভজনক ব্যবস্থার পথ প্রশস্ত হবে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
কৃষাণী আশালতা বলেন, কৃষি প্রযুক্তি ইতিহাসে ২০ নভেম্বর ইতিহাস মন্ডিত দিন হিসাবে থেকে যাবে। কৃষক তুফান বিশ^াস জানান, তাদের অঞ্চলটিই মুলত কৃষি অঞ্চল। তারা সারাজীবন ধরেই কৃষি কাজের সাথে যুক্ত কিন্তু এমন বৈজ্ঞানিক ধারণা কৃষকদের আধুনিক ও প্রগতিশীল কৃষকে রুপান্তরিত করবে।
খুলনা স্যাটেলাইট স্টেশনের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিল¬াল হোসাইন প্রযুক্তি গ্রামের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে মোট ১৫টি প্রযুক্তি গ্রাম সৃষ্টি হবে যার মাধ্যমে ব্রি উদ্ভাবিত ধান চাষাবাদ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রযুক্তি দ্রুততম সময়ে কৃষকদের কাছে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। তিনি ব্রি উদ্ভাবিত বীজ বপন যন্ত্র সরেজমিনে চালিয়ে কৃষকদের দেখান। তিনি বলে, এই যন্ত্রের সাহায্যে একজন শ্রমিক প্রতি ঘন্টায় ৭২০০টি ট্রেতে বীজ বপন করতে পারে, যেখানে হাতে মাত্র ৫০-৬০ টি ট্রেতে বীজ বপন করা যায় যা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য এবং সময় সাপেক্ষ। ব্রি বীজ বপন যন্ত্রসময়, শ্রমও অর্থ তিন ক্ষেত্রেই সাশ্রয়। এতে করে অনেক কৃষকউদ্বুদ্ধ হয়ে যান্ত্রিকভাবে চারা রোপণ ও চারা তৈরির আগ্রহ প্রকাশ করেন। আসন্ন বোরো মওসুমে কৃষকের ১৫ বিঘা জমিতে চারা রোপণ যন্ত্রের পরীক্ষণ ও মূল্যায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে বলেও তিনি উলে¬খ করেন। তিনি আরও বলেন, “সীমিত জমি ও সম্পদের মাঝে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি তথা কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই।” খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার বয়ারডাঙ্গা গ্রামকে তাই এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় ব্রি প্রযুক্তি গ্রামে রূপান্তরিত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এউ প্রযুক্তি গ্রামের ধারণা সমগ্র খুলনা বিভাগেই শুধু ছড়িয়ে দেয়া হবে না। সারা দেশে এমন মডেল স্থাপিত হবে।
কৃষক গুরুচাঁদ বৈরাগী বলেন, এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় বয়ারডাঙ্গায় ব্রি প্রযুক্তি গ্রামের এই কার্যক্রম শুধু বীজ বিতরণ বা মাঠ দিবসেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই, লাভজনক ও আধুনিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের এক বাস্তব রূপরেখা। লবণসহিষ্ণু জাত থেকে শুরু করে পুষ্টিসমৃদ্ধ, উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড ধান ব্রি উদ্ভাবিত এসব জাত এবং যান্ত্রিক চারা উৎপাদন প্রযুক্তি কৃষকদের হাতে পৌঁছে যাওয়ায় নতুন করে জেগে উঠেছে উৎপাদন বৃদ্ধি ও ব্যয়ের সাশ্রয়ের আশা। কৃষকরা বিশ্বাস করেন, প্রযুক্তি গ্রামের মাধ্যমে জ্ঞান, যন্ত্র ও উন্নত বীজ এই তিনের সমন্বয় তাঁদের চাষাবাদকে আরও শক্তিশালী করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের মডেল গ্রামই হবে আগামী দিনের কৃষি অগ্রযাত্রার প্রধান ভরসা।
