বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

গৃহবধূ থেকে আপসহীন নেত্রী: খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রাম

নিজস্ব প্রতিনিধি :
ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫ ৩:৪৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বিএনপিতে যখন কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব ঠিক করার আলোচনা চলছিল, ঠিক তখনই সামরিক ও শাসকচক্রের মনে সবচেয়ে বড় ভয় তৈরি হয় খালেদা জিয়াকে নিয়ে। কারণ, দলের একটি অংশ মনে করত, প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার জন্য খালেদা জিয়াই ছিলেন সে সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি। প্রয়াত বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ তাঁর ‘চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা’ বইতে লিখেছেন, ‘বেগম জিয়া যদি প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চাইতেন, তাহলে অন্য কারো প্রার্থী হওয়ার তখন আর প্রশ্ন উঠতো না।’ কিন্তু সেনাপ্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদের ইচ্ছানুযায়ী তড়িঘড়ি করে বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়।

রাজনীতিতে অনীহা ও দলের আবদার

জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মানসিক ধকল এবং পারিবারিক অনীহার কারণে খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসার কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি হয়তো ভাবতে শুরু করেছিলেন, রাজনীতি মানুষকে করুণ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। তাঁর বাবাও মেয়ের রাজনীতিতে আসার বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন না।

তবে বিচারপতি সাত্তারের বার্ধক্য এবং দল পরিচালনায় অসন্তোষের কারণে তৎকালীন বিএনপির একাংশ তাঁকে রাজনীতিতে আনার পরিকল্পনা করে। দলের নেতা-কর্মীরা দিনের পর দিন তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তিনি দলের হাল না ধরলে বিএনপি টিকবে না। দলীয় ঐক্যের জন্য ‘আপস ফর্মুলা’ হিসেবে তাঁকে বেছে নেওয়া হয়। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। কারণ, তিনি ক্ষমতা দখলের দীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এবং জানতেন, খালেদা জিয়া রাজনীতিতে এলে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হবে।

কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন, নুরুল ইসলাম শিশু, এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, নজরুল ইসলাম খান, জমির উদ্দিন সরকার এবং মওদুদ আহমদের মতো সিনিয়র নেতারা তাঁকে রাজনীতিতে আনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান। ছবি: আজকের পত্রিকা
খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান। 

চেয়ারম্যান নির্বাচন ও সামরিক অভ্যুত্থান

অবশেষে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে খালেদা জিয়ার আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করেন। একই বছর ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থলে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনকালে তিনি প্রথম রাজনৈতিক বক্তব্য দেন।

১৯৮২ সালের ২১ জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচনকে ঘিরে আবার চরম বিভক্তি দেখা দেয়। খালেদা জিয়া এবং রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার—উভয়ই প্রার্থী হন। বিচারপতি সাত্তার তাঁকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার অনুরোধ জানালেও খালেদা জিয়া তা গ্রহণ করেননি। শেষ পর্যন্ত দলের ঐক্যের স্বার্থে তিনি তাঁর প্রার্থীর পদ প্রত্যাহার করেন।

কিন্তু এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। সাত্তারের রাজনৈতিক গুরুত্ব এতে সম্পূর্ণ ফুরিয়ে যায়। আনুষ্ঠানিক চেয়ারম্যান সাত্তার থাকলেও দল পরিচালনায় খালেদা জিয়ার প্রভাব বাড়তে থাকে।

১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারপারসন হন এবং এপ্রিলের প্রথম দিকে বর্ধিত সভায় ভাষণ দেন। এক বছরের মধ্যেই, ১৯৮৪ সালের ১০ই মে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। মওদুদ আহমদ দাবি করেন, এই পদে তাঁকে দেখতে সামরিক বা গোয়েন্দা বিভাগ কেউই চায়নি, কিন্তু দলের কর্মীদের চাপে তা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়।

জিয়া পরিবার
জিয়া পরিবার

স্বৈরশাসকবিরোধী সংগ্রাম ও রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠান

চেয়ারম্যান হওয়ার পর খালেদা জিয়া এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন নেতৃত্ব তাঁকে দেশজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁকে কয়েকবার আটক করা হলেও তিনি আন্দোলন থেকে সরে যাননি।

জেনারেল এরশাদের পতনের পর, ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বিজয় লাভ করে। রাজনীতিতে আসার মাত্র ১০ বছরের মধ্যেই দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তাঁর নেতৃত্বেই বিএনপি ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬—দুই মেয়াদে সরকার পরিচালনা করে।

শেষ পর্ব: মামলা, দণ্ড এবং নিঃসঙ্গতা

রাজনৈতিক জীবনে যতগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, খালেদা জিয়া তার সবগুলোতে জয়ী হয়েছেন। তবে ২০০১ সালে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সরকার একের পর এক বিতর্কের মুখে পড়ে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলের ভরাডুবি হয় এবং বিএনপি রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের পর দলটি আরও গভীর সংকটে নিপতিত হয়। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া দুর্নীতির মামলাগুলো শেষ জীবনে তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হওয়ায় তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।

২০১৮ সাল থেকে তিনি কারাবন্দি হন এবং পরে নির্বাহী আদেশে কারাগারের বাইরে থাকলেও নানা বিধিনিষেধের কারণে রাজনীতিতে অংশ নিতে বা বিদেশ যেতে পারেননি। এমন চিকিৎসার জন্যও তাঁকে বিদেশে নেওয়ার অনুমতি দেয়নি আওয়ামী লীগ সরকার। অবশেষে গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার সাজা মওকুফ করা হয়। এরপর ৭ আগস্ট তিনি মুক্তি পান।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গৃহবধূর এমন চমকপ্রদ উত্থান ও আপসহীন সংগ্রাম বহু বিতর্ক সত্ত্বেও ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র: ‘বিএনপি: সময়-অসময়’, লেখক: মহিউদ্দিন আহমদ; ‘চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা’, মওদুদ আহমদ, বিবিসি

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।